খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালা চূড়ান্ত হলেও বাস্তবে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে না। আগের সরকারের মতোই নতুন সরকারও ইলন মাস্কের উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চাইবে।
ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভক্ত
দেশের ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো (আইএসপি) স্টারলিংকের আগমনকে প্রতিযোগিতামূলক হুমকি হিসেবে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হতে পারবে না এবং বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলে যাবে।
অন্যদিকে, মোবাইল অপারেটররা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তারা বলছেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম এলাকাগুলোতেও সহজে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের ইন্টারনেট কাঠামো
বর্তমানে বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংযোগ নির্ভর করে সাবমেরিন কেবল ও আইটিসি অপারেটরের ওপর। এসব অপারেটর থেকে ব্যান্ডউইথ কিনে আইআইজি এবং পরে আইএসপি মারফত ইন্টারনেট পৌঁছে সাধারণ মানুষের কাছে।
বর্তমানে দেশের ইন্টারনেট চাহিদা ৫,২০০ জিবিপিএস। এর মধ্যে ২,২০০ জিবিপিএস সরবরাহ করছে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি, আর বাকি ৩,০০০ জিবিপিএস আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে।
স্টারলিংক কী?
ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ২০১৫ সালে স্টারলিংক প্রকল্প শুরু করে। এটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫৫০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে চলাচলকারী হাজারো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দেয়। ২০২4 সালের জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, স্টারলিংক ৬,৯৯৪টি স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপন করেছে এবং ১০০টির বেশি দেশে এই সেবা চালু রয়েছে।
স্টারলিংক ব্যবহারকারীরা গড়ে ১০০ এমবিপিএসের বেশি গতি পান। তুলনায়, বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গড় ডাউনলোড গতি মাত্র ৪০ এমবিপিএস এবং ব্রডব্যান্ডে ৫১ এমবিপিএস।
কেন হঠাৎ স্টারলিংক?
গত বছর থেকে বাংলাদেশে স্টারলিংকের সেবা চালুর আলোচনা চলছে। জুলাই আন্দোলনের পর তা নতুন করে গতি পায়। ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইলন মাস্কের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে পাঠানো চিঠিতে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে সেবা চালুর প্রস্তাব দেন ইউনূস।
গত সপ্তাহে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানান, স্টারলিংক নিয়ে কাজ চলছে। প্রেস সচিবও জানান, ইন্টারনেট শাটডাউনের পথ রুদ্ধ করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
স্বাধীনতা না নিয়ন্ত্রণ?
তবে প্রযুক্তিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, স্টারলিংকের মাধ্যমে অবারিত ইন্টারনেট স্বাধীনতা সম্ভব নয়। কারণ স্টারলিংক বাংলাদেশে আইএসপির মতোই কাজ করবে এবং তাকে আইআইজি থেকে ব্যান্ডউইথ কিনতে হবে। ফলে সরকার চাইলে অন্যান্য আইএসপির মতো তাদের কার্যক্রমও সীমিত করতে পারবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক সুমন আহমেদ সাবির বলেন, 'স্টারলিংকের ব্যয় সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এখনো অনেক বেশি। মাসিক খরচ ১৫ হাজার টাকা, সঙ্গে সংযোগ যন্ত্রপাতির জন্য লাগবে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা।'
তিনি আরও বলেন, 'এছাড়া এনটিএমসির মতো নজরদারি প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের ওপরও আড়ি পাততে পারে। সুতরাং এটি সম্পূর্ণ মুক্ত ইন্টারনেটের প্রতীক নয়। বরং এটি হতে পারে একটি নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রিত কাঠামো।'
সারসংক্ষেপ:
স্টারলিংকের আগমন ইন্টারনেট খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে। তবে এটি কতটা স্বাধীনতা দেবে, আর কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে—তা নির্ভর করবে নীতিমালা ও সরকারের সদিচ্ছার ওপর। এখন দেখার বিষয়, প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে, নাকি এটি হবে আরেকটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর অংশ।

0 Comments